Subscribe Us

header ads

ইতিকাফের বিধান ও পালনের নিয়ম


ট : ২
রমজানের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ‘এতেকাফ’। এ মাসের শেষ দশকে মসজিদে ইতিকাফ করা সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) সারা জীবন মহৎ আমলটি করে গেছেন। ইমাম জুহরি (রহ.) বলেন, ‘অনেক আমল তো নবীজি কখনো করেছেন, কখনো ছেড়েছেন। কিন্তু ইতিকাফের আমলটি তিনি কখনোই ছেড়ে দেননি। অথচ এই মর্যাদাপূর্ণ আমলটির ব্যাপারে মানুষ তেমন গুরুত্ব দেয় না।’ 








ইতিকাফ কী?
এতেকাফ আরবি শব্দ। এর অর্থ স্থির থাকা বা অবস্থান করা। শরিয়তের পরিভাষায় জাগতিক কার্যকলাপ ও পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সওয়াবের উদ্দেশ্যে মসজিদে বা ঘরের নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করা বা স্থিতিশীল থাকাকে ইতিকাফ বলে। ইতিকাফ সুন্নতে মুয়াক্কাদা কিফায়া। রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করা সুন্নত। কোনো একটি ছোট্ট জনপদের কেউ এতেকাফ করলে জনপদের বাকিদের ওপর থেকে এর দায় ঘুচে যায়। তবে ওই জনপদের কেউ যদি এতেকাফ না করে, তা হলে সবাই সুন্নতে মুয়াক্কাদা বর্জনের দায়ে দায়ী হবেন। রমজানের ২০ তারিখ সূর্যাস্তের পূর্ব থেকেই ইতিকাফ শুরু করতে হবে এবং ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখা যাওয়া পর্যন্ত ইতিকাফ অবস্থায় থাকতে হবে। 

ইতিকাফের গুরুত্ব
এতেকাফ আল্লাহর নৈকট্য লাভের সহজ উপায়। তাঁর সঙ্গে সুনিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যম। কারণ মানুষ যখন সংসার-জগতের কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে আল্লাহর ঘরে ইবাদতের নিমিত্তে আত্মনিয়োগ করবে তখন দয়াবান স্রষ্টা কি তার থেকে বিমুখ থাকতে পারেন? তিনি তো ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন-‘বান্দা আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হলে আমি তার দিকে দুই হাত অগ্রসর হই। আমার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলে আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।’ হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রয়েছে-‘কেউ যখন আল্লাহর ঘর মসজিদে অবস্থান নেয় তখন আল্লাহ তায়ালা এত বেশি আনন্দিত হন, যেমন বিদেশ-বিভুঁই থেকে কেউ বাড়িতে এলে আপনজনরা আনন্দিত হয়ে থাকে।’ (তারগিব-তারহিব : ৩২২) 

ইতিকাফের ফজিলত 
ইতিকাফের ফজিলত ও বৈশিষ্ট্য অপরিসীম। এর কল্যাণ ও উপকারিতা বর্ণনাতীত। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘ইতিকাফকারী যাবতীয় গুনাহ থেকে মুক্ত থাকে এবং তার জন্য ওই পরিমাণ নেকি লেখা হয়, যা আমলকারীর জন্য লেখা হয়’ (ইবনে মাজা)। হাদিস থেকে বোঝা যায়, ইতিকাফকারী ব্যক্তি ঘুমন্ত-জাগ্রত সর্বাবস্থায় ইবাদতকারী হিসেবে গণ্য হয়। আল্লাহর ঘর মসজিদে অবস্থান করার কারণে তার দ্বারা পাপকর্মও সংঘটিত হয় না। বরং মানবশত্রু শয়তানের আক্রমণ থেকে সে বেঁচে যায়। অন্য একটি হাদিসে রয়েছে ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একদিন ইতিকাফ করে আল্লাহ তায়ালা তাকে জাহান্নাম থেকে তিন খন্দক দূরে সরিয়ে দেন। প্রত্যেক খন্দকের পরিমাণ আসমান ও জমিনের দূরত্বের সমান’ (তাবরানি ও বায়হাকি)। এ হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়, এতেকাফকারী ব্যক্তি পরকালে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করবে। 

ইতিকাফের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর মাগফিরাতের বারি দ্বারা সিক্ত হয়। কারণ এতেকাফকারীর দৃষ্টান্ত প্রিয়তমের দরবারে প্রেমিকের আশ্রয় গ্রহণ কিংবা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে কারও বাড়িতে অনশন করা। এ রকম অবস্থানের ফলে পাষাণ ব্যক্তির হৃদয়ও বিগলিত হয়। অন্তরে ভেসে ওঠে দয়া-মায়ার ঢেউ। তা হলে অসীম দয়ালু আল্লাহর ঘরে অবস্থান করে কেউ কি বঞ্চিত হবে? হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে নিজ ঘর থেকে উত্তমরূপে ওজু করে মসজিদে আসে সে আল্লাহর মেহমান। আর মেহমানকে সম্মান করা মেজবানের দায়িত্ব।’ (তাবরানি কাবির)

ইতিকাফের একটি বড় দিক হচ্ছে এর ফলে শবে কদর পাওয়া অনেকটা নিশ্চিত। কারণ শবে কদর রমজানের শেষ দশকে রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) মূলত শবে কদরের অন্বেষণেই ইতিকাফ করতেন। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) সূত্রে বর্ণিত হাদিসে রয়েছে-রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি শবে কদরের উদ্দেশ্যে রমজানের প্রথম দশকে ইতিকাফ করেছিলাম। দ্বিতীয় দশকেও একই উদ্দেশ্যে ইতিকাফ করেছি। কিন্তু আমাকে জানানো হলো তা শেষ দশকে। অতএব যারা আমার সঙ্গে ইতিকাফ করেছ তারা যেন শেষ দশকেও ইতিকাফ করে।’ (বুখারি ও মুসলিম) 

ইতিকাফের শর্ত
১. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায় করা হয়, এমন মসজিদে ইতিকাফ করা আবশ্যক। তবে মহিলারা ঘরে একটি স্থান নির্ধারণ করে ইতিকাফ করবে। 
২. ইতিকাফের জন্য নিয়ত অপরিহার্য। নিয়ত ব্যতীত মসজিদে অবস্থান করলে ইতিকাফ হিসেবে গণ্য হবে না। 
৩. ওয়াজিব এবং সুন্নত ইতিকাফের জন্য রোজা রাখা জরুরি। তবে নফল ইতিকাফের জন্য রোজা জরুরি নয়। 
৪. মহিলাদের ইতিকাফের জন্য হায়েজ-নেফাজ থেকে পবিত্র হওয়া আবশ্যক। 
৫. এতেকাফের জন্য প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া শর্ত নয়। অপ্রাপ্ত বুঝমান ছেলেরা ইতিকাফ করতে পারবে। তবে তাদের ইতিকাফ হবে নফল। 

ইতিকাফের করণীয়-বর্জনীয়
শরয়ি বা তাবয়ি (প্রাকৃতিক) প্রয়োজন ছাড়া মসজিদ থেকে বের হলে ইতিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে। এমনিভাবে ওজু বা ইস্তিঞ্জা করতে গিয়ে অযথা সময়ক্ষেপণ করা যাবে না। গোসল ফরজ না হলে গোসল করার জন্য মসজিদের বাইরে যাওয়ার অনুমতি নেই। এতেকাফ অবস্থায় বেহুদা কথাবার্তা, গিবত-পরনিন্দা, ঝগড়া-বিবাদ, মসজিদে উঁচুস্বরে কথা বলা বা হইচই করা সম্পূর্ণ নিষেধ। আল্লামা ইবনুল কাইয়িম (রহ.) লেখেন, ‘ইতিকাফের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মহামহিম আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা। হৃদয়-মনে একমাত্র তাঁর ধ্যান-খেয়াল জাগরূক রাখা। পার্থিব জগতের সবকিছুর মায়াজাল ছিন্ন করে একমাত্র আল্লাহর মহব্বতে ডুবে থাকা।’ সুতরাং ইতিকাফকারী চুপচাপ বসে না থেকে কোনো না কোনো ইবাদতে মগ্ন থাকবেন। বিশুদ্ধভাবে কুরআন পড়তে পারলে বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করবেন। নফল নামাজ, দরুদ শরিফ, ইস্তিগফার ও কালেমার জিকিরের প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব দেবেন। ইশরাক, চাশত, আওয়াবিন ও তাহাজ্জুদ নামাজের প্রতি যত্নশীল হবেন। প্রতিদিন একবার সালাতুস তসবিহ আদায় করবেন। বিজোড় রাতগুলো শবে কদরের তালাশে অধিক পরিমাণে ইবাদত করবেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ